স্টাফ রিপোর্টার: অর্থের মহনায় জন্মদাতার নাম পাল্টিয়ে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায় টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছেন সাতপাকিয়া গ্রামের শফিকুল ইসলাম মুলু মুন্সি

শেরপুর সদর উপজেলার ১০ নং চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের সাতপাকিয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা মাওলানা শফিকুল ইসলাম ওরফে মুলু মুন্সি অর্থের প্রভাবে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে। দেশের বিভিন্ন সুনামধন্য পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে তার নানা কুকীর্তির খবর প্রকাশিত হলেও এখনও প্রশাসন বা দুদকের নজরে আসেনি।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় উত্থান
বিগত ফ্যাসিবাদ সরকারের সময় আওয়ামী লীগের ছায়াতলে মিটিং-মিছিলে যোগ দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করাই ছিল তার প্রধান কৌশল। মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষে প্রথমে কৃষিকাজে ব্যর্থ হয়ে তিনি স্থানীয়ভাবে বালু ব্যবসায় যুক্ত হন। জনৈক খোকা মিয়ার সহায়তায় ব্যবসা শুরু করলেও পরে তাকে সরিয়ে দিয়ে এককভাবে ফেরিঘাট এলাকায় বালু ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার করেন।
অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়া
ক্রমে তিনি অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বালু উত্তোলন, বাজার ও হাটবাজার দখল, সিএনজি ও অটোরিকশা থেকে জিবি উত্তোলনসহ নানা অবৈধ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। তার নিয়ন্ত্রণে ছিল শেরপুর-জামালপুর রোড, বারুয়ামারী রোড ও বলাইরচর-পাইকেরতলা রোডের জিবি উত্তোলন। মাদ্রাসার নামে এসব অর্থ উত্তোলন করে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করতেন তিনি।
জমি দখল ও অর্থ আত্মসাৎ
১৯৯৮ সালে তিনি গরু, ছাগল ও বাইসাইকেলের হাট চালু করে সেখান থেকেও অর্থ আত্মসাৎ করেন। জামালপুর-শেরপুর ব্রহ্মপুত্র ব্রীজ চালু হওয়ার পর তিনি সেখানেও অবৈধভাবে সিএনজি ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড বসিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। বাজার ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তিনি নানা অজুহাতে টাকা আদায় করতেন।
অভিযোগ ও অনিয়ম
সরেজমিনে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে শালিসে উৎকোচ গ্রহণ, জোরপূর্বক জমি দখল, হুন্ডি ব্যবসা, মামলা দিয়ে হয়রানি, এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষকদের দ্বারা বলৎকারের ঘটনাও ক্ষমতার দাপটে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, জন্মদাতা আলহাজ আব্দুস ছামাদের নাম বদলে এফিডেভিটের মাধ্যমে নিজের কাগজপত্রে মোঃ মকবুল হোসেনকে পিতা হিসেবে দেখিয়ে কাজীর লাইসেন্সও জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জন করেন।
বিপুল সম্পদের মালিক
বর্তমানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক। বলাইরচর মৌজায় ৮০ বিঘা, চরযথার্থপুর মৌজায় ২৫ বিঘা, চরপক্ষীমারীতে ৩০ বিঘা জমি ছাড়াও জামালপুর ও শেরপুরে একাধিক জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার মালিকানায় রয়েছে। শেরপুর সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র ব্রীজপাড়ে রয়েছে হাজী এন্টারপ্রাইজ ডাচ্বাংলা এজেন্ট ব্যাংক এবং ঝিনাইগাতীতে বিশাল পরিসরে একটি পেট্রোল পাম্প।
সংগঠন ও রাজনীতিতে প্রভাব
বর্তমানে তিনি খেলাফতে মজলিশ শেরপুর জেলা শাখার সভাপতি ও সদর-১ আসনের এমপি প্রার্থী। অভিযোগ রয়েছে, সংগঠনের ছায়াতলে থেকেও তিনি সাধারণ মানুষকে হয়রানি, জুলুম ও নির্যাতন করে যাচ্ছেন।
চলতি বছরের ২৬ আগস্ট সাতপাকিয়া ব্রহ্মপুত্র ব্রীজপাড় এলাকায় স্থানীয় এক যুবককে হত্যার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে তার ভাগিনা পিচ্চি সোহেলের বিরুদ্ধে, যা নাকি মুলু মুন্সির নির্দেশেই সংঘটিত হয়েছে।
প্রশাসনের নীরব ভূমিকা
উল্লেখ্য, একাধিক মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রশাসনের নাকের ডগায় অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এত বিপুল সম্পদ গড়ার পরও কেন দুদক বা প্রশাসনের ভূমিকা নীরব রয়েছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
এ বিষয়ে শেরপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুবায়দুল আলমের কাছে জানতে চাইলে, তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রশাসন ও দুদকের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।