বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শের কথা বলা হয় বেশি, কিন্তু বাস্তবে সম্পর্ক ও আত্মীয়তার প্রভাবই অনেক সময় রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে। কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ–তাড়াইল) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’র প্রার্থী হিসেবে কর্নেল (অব.) অধ্যাপক ডা. জেহাদ খানের নির্বাচনী মাঠে নামা সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
কারণ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ডা. জেহাদ খান সাবেক রাষ্ট্রপতি ও দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপ্রধান মো. আব্দুল হামিদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী—এই দুই রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু ভিন্ন নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে পরস্পরবিরোধী। সেই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির নিকট আত্মীয়ের জামায়াতের ব্যানারে নির্বাচন করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুতর রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
প্রশ্ন একটাই নয়—প্রশ্ন অনেক।
এই আত্মীয়তা কি শুধুই পারিবারিক, নাকি এর পেছনে রয়েছে নীরব রাজনৈতিক সমীকরণ?
ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কি একজন প্রার্থী সত্যিই নিজেকে পুরোপুরি ‘বিরোধী রাজনীতির’ প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন?
নাকি এটাই বাংলাদেশের রাজনীতির সেই চেনা চিত্র—যেখানে আদর্শের বাইরে গিয়েও সম্পর্ক সবসময় একটি নিরাপদ ছায়া তৈরি করে?
ডা. জেহাদ খান নিজেকে একজন আদর্শিক জামায়াত কর্মী হিসেবে তুলে ধরছেন এবং বলছেন, তার রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কোনো যোগসূত্র নেই। বক্তব্যে বিষয়টি সহজ মনে হলেও বাস্তবতা এতটা সরল নয়। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আত্মীয়তা কখনোই কেবল ব্যক্তিগত থাকে না—বিশেষ করে যখন সেই আত্মীয় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরের সঙ্গে যুক্ত।
এখানে পরিষ্কার করে বলা জরুরি—এখন পর্যন্ত ডা. জেহাদ খান বা তার আত্মীয়তার বিষয়ে কোনো আইনগত অভিযোগ, দুর্নীতির মামলা কিংবা সরকারি তদন্ত নেই। কিন্তু রাজনীতিতে সব প্রশ্ন আদালতে নিষ্পত্তি হয় না। কিছু প্রশ্ন থাকে নৈতিকতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতার জায়গায়। জনগণের রাজনীতিতে আস্থার প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রার্থিতা আরেকটি বড় সত্যকে সামনে নিয়ে আসে—বাংলাদেশে রাজনীতি কি আদৌ আদর্শভিত্তিক? নাকি ক্ষমতার বলয়ে থাকা সম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সব দরজা খোলা রাখে? যদি আত্মীয়তা সত্যিই অপ্রাসঙ্গিক হয়, তবে তা নিয়ে এত আলোচনা কেন? আর যদি প্রাসঙ্গিক না হয়, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে ডা. জেহাদ খানের প্রার্থিতা তাই শুধুমাত্র একটি আসনের নির্বাচন নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির চরিত্র, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার ওপর এক ধরনের পরীক্ষা। এই পরীক্ষা শুধু একজন প্রার্থীর নয়—বরং পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির।
শেষ পর্যন্ত ভোটের রায়ই বলে দেবে জনগণ এই প্রার্থিতাকে কীভাবে দেখছে। কিন্তু প্রশ্ন তোলা থামানো যাবে না। কারণ গণতন্ত্র প্রশ্ন দিয়েই বাঁচে, নীরবতা দিয়ে নয়।
সম্পাদক
মোঃ রবিউল আওয়াল