নিজস্ব প্রতিবেদক:কারা বিভাগের এক মহিলা কারারক্ষীকে ঘিরে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীর দাবি, তদন্ত কমিটির কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত মহিলা কারারক্ষী জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি তদন্ত চলাকালীন তাকে সাময়িক বরখাস্ত না করায় তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী তার স্বামী মোহাম্মদ রবিউল আউয়াল।
জানা গেছে, কারারক্ষী নং-২২২২৭ জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে তার স্বামী মোহাম্মদ রবিউল আউয়াল কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন)-এর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, তার স্ত্রীর সঙ্গে কারা বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির অনৈতিক যোগাযোগ ও সম্পর্কের বিষয়ে তার কাছে অডিও-ভিডিও, কল রেকর্ড, WhatsApp যোগাযোগ, মেসেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, প্রায় ১৮ বছরের দাম্পত্য জীবনে তাদের দুই সন্তান রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্ত্রীর আচরণ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে জেসমিন আক্তার তার কাছে কিছু বক্তব্য দেন, যা অডিও ও ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
রবিউল আউয়ালের ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্ত কমিটির কাছে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট, অডিও-ভিডিও রেকর্ড, কললিস্ট, WhatsApp-এর যোগাযোগ, মেসেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। এসব তথ্য-প্রমাণের নিরপেক্ষ ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে তার অভিযোগ, এত তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের পরও অভিযুক্ত মহিলা কারারক্ষীর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তার প্রশ্ন, তদন্ত চলাকালে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা বা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি কেন বিবেচনা করা হচ্ছে না।
রবিউল আউয়াল আরও অভিযোগ করেন, তদন্ত কমিটি তার দেওয়া অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ যাচাইয়ের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন বিষয় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।
তার দাবি, তদন্তের মূল বিষয় হওয়া উচিত ছিল জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের সত্যতা যাচাই। কিন্তু তদন্তের গতিপ্রকৃতি দেখে তার মনে হচ্ছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ তৈরি করা যায় কি না, সে বিষয়েও অনুসন্ধান চলছে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, তদন্ত চলাকালীন জেসমিন আক্তারকে ছুটি দিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণ তিনি তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করেছেন বলে দাবি করেন।
তার অভিযোগ, কাশিমপুর ডিআইজি প্রিজন কার্যালয়ে সংযুক্ত থাকা অবস্থায় জেসমিন আক্তাকে বিভিন্ন সময় ছুটি দেওয়া হয় এবং তার স্বামীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাকে ব্যবহার করা হয়েছে।
এমনকি তার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্য এবং পরবর্তীতে সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তার ভূমিকা রয়েছে কি না, তা তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন রবিউল আউয়াল।
এর আগে রবিউল আউয়াল দাবি করেন, ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে তার স্ত্রী জেসমিন আক্তার তার কাছে স্বেচ্ছায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে তার কথিত অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।
পরবর্তীতে ওই বক্তব্যের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানতে পারার পর জেসমিনের মোবাইল ও WhatsApp নম্বরে একাধিকবার ফোন করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং পূর্বের বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রবিউল আউয়ালের আরও দাবি, তার স্ত্রীকে স্বামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে এবং তাকে মারধর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগ করতে চাপ দেওয়া হয়েছিল। চাকরি হারানো এবং সন্তানদের ক্ষতির ভয় দেখানোর অভিযোগও করেন তিনি।
এ বিষয়ে জেসমিন আক্তারের নামে একটি পৃথক লিখিত বক্তব্যের কথাও জানা গেছে। সেখানে তার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, স্বামীর কাছে দেওয়া পূর্বের বক্তব্য তিনি স্বেচ্ছায় দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে ভয়ভীতি ও চাপের কারণে স্বামীর বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে বাধ্য হয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগের পাশাপাশি দুই সন্তানের জৈবিক পিতৃত্ব নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে তদন্ত কমিটির কাছে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করেছেন রবিউল আউয়াল।
তার আবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তার দুই সন্তান, জেসমিন আক্তার, প্রয়োজনে তার নিজের এবং তদন্তের সঙ্গে সরাসরি প্রাসঙ্গিক বিবেচিত অন্য ব্যক্তিদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হোক।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেছেন, যেসব ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রীর শারীরিক সম্পর্কের অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের সঙ্গে আইনগতভাবে প্রাসঙ্গিক হলে তাদের ডিএনএ প্রোফাইল ও প্রয়োজনীয় ফরেনসিক আলামত পরীক্ষা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে অভিযোগের সঙ্গে কোনো জৈবিক প্রমাণের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
রবিউল আউয়ালের অভিযোগ, যাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তাদের তুলনায় অধস্তন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত পরিচালিত হওয়ায় শুরু থেকেই তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে তার মধ্যে আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি কারও বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা চাই না। আমি শুধু চাই, আমার দেওয়া প্রতিটি তথ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে আসুক।”
তার আরও দাবি, তদন্তের সময় অভিযুক্তকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হলে তদন্তে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা কমতে পারে। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তদন্ত সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, একদিকে তদন্ত কমিটির কাছে বিপুল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ জমা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে অভিযুক্ত মহিলা কারারক্ষীর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেই। একই সময়ে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেই বিভিন্ন বিষয় খোঁজা হচ্ছে এবং তার স্ত্রীকে দিয়ে একের পর এক আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
এ অবস্থায় তদন্তটি প্রকৃত সত্য উদঘাটনের জন্য পরিচালিত হচ্ছে, নাকি অভিযুক্তদের রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে—এমন প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে বলে দাবি করেন রবিউল আউয়াল।
তিনি তদন্ত কমিটির কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবমুক্ত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি, প্রয়োজনে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সহায়তা এবং উপস্থাপিত সব তথ্য-প্রমাণের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা দাবি করেছেন।
তবে জেসমিন আক্তার ও অভিযোগে উল্লিখিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের রায়ে প্রমাণিত হয়নি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে এবং তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।