
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন খুশি। একই সঙ্গে নিখোঁজ স্বামীকে দ্রুত উদ্ধার এবং জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে খুশি অভিযোগ করেন, তার স্বামীকে কারামুক্ত করে দেওয়া এবং নতুন কোনো মামলায় না জড়ানোর আশ্বাস দিয়ে জাহাঙ্গীর আলম ধাপে ধাপে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নেন। নগদ, বিকাশ ও ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। টাকা জোগাড় করতে তাদের গাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কার পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে বলেও জানান খুশি।
তার অভিযোগ, পরবর্তীতে জেলগেট থেকে রাজাকে বের করে দেওয়ার কথা বলে আরও ২০ লাখ টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে বিপুল অর্থ দেওয়ার পরও তার স্বামী মুক্তি পাননি। বরং তাকে একের পর এক নতুন মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও অনৈতিক সম্পর্কের জন্য চাপ প্রয়োগের অভিযোগও করেন খুশি। তার দাবি, জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করলে তার স্বামীকে কারাগার থেকে কখনো বের হতে দেওয়া হবে না—এমন ভয়ভীতি দেখানো হতো। অভিযোগের পক্ষে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনশট, বিকাশ লেনদেনের তথ্য ও কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ থাকার কথাও জানান তিনি।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেছেন, জাহাঙ্গীর আলম বিভিন্ন সময় কারা কর্তৃপক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কারাগারের জেল সুপার, জেলার এবং কারা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে নিজের প্রভাব ও দাপট প্রদর্শন করতেন তিনি।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোনো বন্দির বিষয়ে কথা বলা, কারাগারে তার অবস্থান কিংবা কারাগার থেকে মুক্তির বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হতো। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করে সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করার অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে নিজের প্রভাব দেখানোর চেষ্টা করতেন। এতে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তেন। বিষয়টি তদন্ত হলে কার সঙ্গে কখন যোগাযোগ করেছেন এবং কী ধরনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছেন, তা বেরিয়ে আসতে পারে।”
আরেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য, কারাগারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একজন বেসরকারি ব্যক্তি কীভাবে এতটা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাদের মতে, কারা কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মকর্তা যদি তার সঙ্গে অনৈতিকভাবে যোগাযোগ বা সহযোগিতা করে থাকেন, সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া উচিত।
তবে এসব বক্তব্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে দেওয়া অভিযোগ ও ভাষ্য। জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে কারা কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় গুমের আশঙ্কা প্রকাশ করে খুশি বলেন, আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার পথে পিচ্চি রাজা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন। তার অভিযোগ, কারাগার ও আদালত প্রাঙ্গণেও জাহাঙ্গীর আলম তার স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ ও ব্ল্যাকমেইল করতেন।
এ কারণে প্রিজনভ্যান থেকে পালানোর ঘটনার আড়ালে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানান তিনি।
প্রকাশিত পুলিশ ও কারা-সংশ্লিষ্ট তথ্যে জানা যায়, আদালত থেকে কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে প্রিজনভ্যান থেকে রাজা পালিয়ে যান। এ ঘটনায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্তের কথাও জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে খুশি আরও অভিযোগ করেন, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে এবং তিনি মাদক কারবারের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
খুশির দাবি, তার স্বামীর কারাগারে থাকা, তাকে মুক্ত করে দেওয়ার আশ্বাসে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ, পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল, প্রিজনভ্যান থেকে নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা এবং জাহাঙ্গীর আলমের কথিত প্রভাব বিস্তারের বিষয়—সবকিছু একসঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিনি নিখোঁজ স্বামীকে দ্রুত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অর্থ আত্মসাৎ, ব্ল্যাকমেইল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য: এসব অভিযোগের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।