
নিজস্ব প্রতিবেদক: দীর্ঘদিন একই কারাগারে কর্মরত থাকার সুযোগ, বদলি নিয়ে বৈষম্য এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ—ময়মনসিংহ বিভাগের কারা প্রশাসনে বদলি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
ময়মনসিংহ বিভাগের ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের অধীন বিভিন্ন কারাগারে কারারক্ষীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কেউ পারিবারিক অসুস্থতা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য একই কর্মস্থলে কিছুদিন থাকার আবেদন করেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, আর্থিক সুবিধা দিতে সক্ষম ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন একই কারাগারে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাবা-মায়ের অসুস্থতা, সন্তানের পড়াশোনা—তবুও মিলছে না বদলির সুবিধা!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কারারক্ষী অভিযোগ করে জানান, তাঁদের বাবা-মায়ের অসুস্থতা, সন্তানদের পড়াশোনা এবং পারিবারিক নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের কাছে তাঁরা কিছুদিনের জন্য একই কর্মস্থলে থাকার আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, এসব মানবিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রত্যাশিত সহযোগিতা করা হয়নি।
অভিযোগকারী কারারক্ষীদের দাবি, পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের দেখাশোনা এবং সন্তানদের পড়াশোনার স্বার্থে সাময়িকভাবে একই কর্মস্থলে থাকার আবেদন করেও তাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন না। অথচ যাঁরা আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন একই কারাগারে থাকার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে আর্থিক লেনদেনের কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এখনো সামনে আসেনি। তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
মহিলা কারারক্ষীদের বদলি নিয়েও প্রশ্ন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহিলা কারারক্ষী অভিযোগ করে বলেন, তাঁরা ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের কাছে বহুবার অনুরোধ ও আকুতি-মিনতি করেও একই কর্মস্থলে দুই বছরের বেশি থাকার সুযোগ পান না বলে তাঁদের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু তাঁর প্রশ্ন, মহিলা কারারক্ষী শামীমা আক্তার হীরা কীভাবে ১২/১৩ বছর দীর্ঘদিন ধরে নেত্রকোনা জেলা কারাগারে বদলি বা প্রেষণে কর্মরত রয়েছেন?
যদি একই কর্মস্থলে থাকার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা বা বদলির নীতিমালা প্রযোজ্য থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সবার ক্ষেত্রে তা সমানভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সেটি যাচাই করা প্রয়োজন। শামীমা আক্তার হীরার দীর্ঘদিন নেত্রকোনায় কর্মরত থাকার পেছনে বৈধ প্রশাসনিক আদেশ, বিশেষ অনুমোদন কিংবা অন্য কোনো যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার করা উচিত।
প্রশ্ন হচ্ছে, বদলির নীতিমালা কি সবার জন্য সমান, নাকি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?
নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও শেরপুরে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার অভিযোগ
প্রাপ্ত তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলা কারাগারে কারারক্ষী নং-১৩৪৬৬ হামিদুর রহমান প্রায় ১২ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। একই কারাগারে কারারক্ষী নং-১৪০৩৬ এ টি এম মেহেদী হাসান প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর ধরে কর্মরত রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া জামালপুর জেলা কারাগারের কারারক্ষী খোকন ১১/১২ বছর একই কারাগারে কর্মরত রয়েছে, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী নং ১২৯৫৩ মেহেদী হাসানকে প্রায় এক বছর আগে বদলি করা হলেও এখনো তাঁকে অবমুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
জামালপুর ও শেরপুর জেলা কারাগারেও একাধিক কারারক্ষীর দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এসব ক্ষেত্রে কারা অধিদপ্তরের বদলি নীতিমালা কীভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, বদলির আদেশ কার্যকর করতে বিলম্বের কারণ কী এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অনুমোদন যথাযথ কর্তৃপক্ষ দিয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।
বদলি বাণিজ্যের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি
কারা প্রশাসনে বদলি ও পদায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বৈষম্যের ধারণা তৈরি হতে পারে।
কারারক্ষীদের একাংশের অভিযোগ, মানবিক ও পারিবারিক সমস্যার কথা জানিয়েও তাঁরা প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না। অন্যদিকে, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাউকে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে রাখার অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই সংশ্লিষ্ট নথি, বদলির আদেশ, অনুমোদন এবং অভিযোগকারীদের বক্তব্য যাচাই করে তদন্ত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যেসব প্রশ্ন
১. দীর্ঘদিন একই কারাগারে কর্মরত কারারক্ষীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বদলি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না?
২. পারিবারিক অসুস্থতা ও সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার্থে একই কর্মস্থলে থাকার আবেদনগুলো কী কারণে বিবেচিত হয়নি?
৩. মহিলা কারারক্ষী শামীমা আক্তার হীরার নেত্রকোনা জেলা কারাগারে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার প্রশাসনিক ভিত্তি কী?
৪. ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের কারারক্ষী মেহেদী হাসানের বদলির আদেশ জারি হয়ে থাকলে তাঁকে এখনো অবমুক্ত না করার কারণ কী?
৫. আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বদলি বা পদায়নে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের কোনো সত্যতা রয়েছে কি না?
৬. ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলা কারাগারে কারারক্ষীদের বদলি ও পদায়নের পূর্ণাঙ্গ নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে কি না?
বদলি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হোক
কারা প্রশাসনে কোনো কর্মচারী যেন অযৌক্তিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত না হন এবং কেউ যেন বিশেষ সুবিধা পেয়ে নিয়মের বাইরে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকতে না পারেন—এটি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের অধীন বদলি ও পদায়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্যও গ্রহণ করা হোক, যাতে পুরো বিষয়টি স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে আসে।
আমাদের দাবি, বদলি ব্যবস্থাপনায় বৈষম্য ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। পারিবারিক মানবিক সংকট বিবেচনায় নেওয়া হোক এবং সরকারি বিধিবিধান সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ করা হোক।