কারা হেডকোয়ার্টারে দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা, শূন্য থাকছে কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদ; বদলি নীতিমালা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: কারা হেডকোয়ার্টারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন, বদলি এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রেখে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কারারক্ষীকে কারা হেডকোয়ার্টারে পদায়ন করা হয়েছে। এর ফলে কারাগারগুলোতে জনবল সংকট তৈরি হচ্ছে এবং নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছুটি ব্যবস্থাপনাতেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কারা হেডকোয়ার্টারে পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিছু কর্মচারীর ক্ষেত্রে বদলির আদেশ কার্যকর হলেও অন্যদের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার অভিযোগ
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মোঃ জাকির হাসান রিয়াল, জেলার (ভারপ্রাপ্ত), দীর্ঘদিন ধরে প্রিজন্স ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে কর্মরত রয়েছেন। তাঁকে ওই ইউনিট থেকে বদলি করা হলেও কিছুদিন পর পুনরায় একই কর্মস্থলে যোগদানের অভিযোগ রয়েছে।
মোঃ ফয়েজ-উর রহমান, উপ-তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত), আইসিটি শাখায় কর্মরত। এ শাখায় কর্মরত থেকে তিনি বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, বিল, ব্যয়ের হিসাব ও অন্যান্য নথি যাচাই করে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া তানিয়া শারমিন, ডেপুটি জেলার, দীর্ঘদিন ধরে কারা অধিদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁকে বদলি করা হলেও কর্মমুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রেখে অধিদপ্তরে পদায়ন
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য রেখে একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কারা হেডকোয়ার্টারে পদায়ন করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
লাবলু, উপ-তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত); আব্দুল মোহাইমেন তূর্য; মোঃ রাশেদুল হাসান রিগ্যান; সুমাইয়া খাতুন; মোঃ মোসফিকুল আলম।
অভিযোগকারীদের মতে, কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত না করে অধিদপ্তরে পদায়ন অব্যাহত থাকলে কারাগারের নিরাপত্তা ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রমে চাপ তৈরি হতে পারে।
কারা হেডকোয়ার্টারে বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘদিন কর্মরত থাকার অভিযোগ
প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী, কারা হেডকোয়ার্টারে বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘদিন ধরে কর্মরত রয়েছেন বলে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
পরিসংখ্যান, বাজেট ও প্রশাসনিক শাখা:
সাঈদা আক্তার (পরিসংখ্যানবিদ), মোঃ দেলোয়ার হোসেন (বাজেট অফিসার), সৈয়দ এমদাদুর রহমান, মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, মোঃ মোস্তফা কামাল, মোঃ আসাদুল হক ও মোঃ সাইদুল হক (প্রশাসনিক কর্মকর্তা)।
প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী:
মোঃ রুহুল আমিন সরকার, মোঃ আবুল বাশার (ভ্রাম্যমাণ নিরীক্ষক), মোঃ আনোয়ার হোসেন, মাহামুদা আক্তার, মোঃ মাহাবুবুর রহমান, মোঃ কহিনুর আকন, আলমগীর সরকার ও বিপ্লব হোসেন (প্রধান সহকারী)।
মোঃ হারুন-অর রশিদ, মোঃ শামীম আল মামুন, মোঃ আঃ কুদ্দুছ শেখ, মোঃ আরিফুল ইসলাম, সুমাইয়া আক্তার, জহুরুল ইসলাম, প্রশান্ত কুমার মণ্ডল, মোঃ ইবনুল হোসেন ও আব্দুস সামাদ (উচ্চমান সহকারী)।
খাদিজা আক্তার ও খন্দকার রাহমিনা আক্তার (সহকারী ভ্রাম্যমাণ নিরীক্ষক), মোঃ শিমুল হোসেন (ক্যাশিয়ার), মোঃ রুহুল আমিন (ডেসপাস রাইডার), মোঃ আহসানউজ্জামান (ডুপ্লিকেটিং মেশিন অপারেটর) এবং হাওয়া আক্তার (নথি সরবরাহকারী)।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ কেউ বিভিন্ন কারাগার বা ডিআইজি অফিস থেকে সংযুক্তি কিংবা প্রেষণে এসে দীর্ঘদিন ধরে কারা হেডকোয়ার্টারে কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের পদায়ন, সংযুক্তির মেয়াদ এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
হিসাবরক্ষক, স্টোর ও কম্পিউটার মুদ্রাক্ষর কর্মীদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন:
কারাগারের বিভিন্ন পদ শূন্য রেখে কারা হেডকোয়ার্টারে কর্মরত রয়েছেন বলে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—
মোঃ আব্দুর রকিব, মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন ও মোঃ আশরাফুল আলম (হিসাবরক্ষক); মোঃ মশিয়ার রহমান (স্টোর কিপার); মোছাঃ তাসলিমা খাতুন ও মোছাঃ সুমনা আক্তার (কারা সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক)।
অভিযোগকারীদের দাবি, কারাগারের স্টোর ও হিসাব ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথ পদে নিয়োজিত কর্মীদের মাধ্যমে পরিচালনা করা প্রয়োজন। অথচ জনবল সংকটের কারণে কোনো কোনো স্থানে কারারক্ষীদের দিয়ে গোডাউনের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাঁট মুদ্রাক্ষরিক ও অফিস সহকারী পদে কর্মরতদের তালিকা
সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে মোঃ হুমায়ুন কবির, মাহবুব হোসেন, মোঃ সালাহউদ্দিন ও মুন্নি আক্তারের নাম পাওয়া গেছে। তাঁদের যথাযথ পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ও পেশাগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অফিস সহকারী পদে সম্প্রতি যোগদান করেছেন বলে যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা হলেন—
মোঃ ইনজামাম আহমেদ, মোঃ সালাহ উদ্দিন রাফি, নিলয় কুমার সরকার, মোঃ রবিউল বাসার, মোঃ ইদ্রিস আলী, অনন্ত সাহা, মোঃ সাকিব হোসেন, মোঃ শরিফুল ইসলাম, শেখ আশিকুজ্জামান (আশিক), সেলিম মিয়া, খোকন মিয়া এবং মোঃ এজিদুল ইসলাম খন্দকার হাফিজ।
কারারক্ষী ও অন্যান্য কর্মচারীর দীর্ঘ তালিকা
কারা হেডকোয়ার্টারে কর্মরত রয়েছেন বলে প্রাপ্ত তালিকায় আরও যাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা হলেন—
মোঃ সাইফুল ইসলাম, মোঃ নাহিদুজ্জামান শেখ, মোঃ সোহরাব হোসেন, মোঃ ইউসুফ জামিল, মোঃ সোহেল রানা, আবু রায়হান, আব্দুর রাকিব, লোকমান হোসেন, অনিক আহমেদ, মোহাম্মদ নুর, মোঃ মিল্লাত, মোঃ সাঈদ হাসান, মোঃ জিয়াউল হক, মোঃ মনোয়ার মোল্লা, নাজমুল আলম, সোহাগ আকন্দ, মোঃ মনিরুল ইসলাম, নুর মোহাম্মদ (রিসিপশন), মোঃ ইমরান হাসান, সাইফুল ইসলাম, মোঃ ইমাম রাসেল, মোঃ আল আমিন, মোঃ ফজলে রাব্বী, রবিউল্লাহ, সাইফুল ইসলাম, আব্দুর রহিম বাহার, মোঃ জাকারিয়া, আব্দুল মতিন (গাড়িচালক), মোঃ বরকত উল্লাহ, জামিনুল ইসলাম, শান্ত চন্দ্র দে, নাহিদ, গোলাম শাহরিয়ার, রফিকুল ইসলাম, মামুন হোসাইন, আরিফুর রহমান, শান্ত দাশ, কনক কুমার মৈত্র, মোঃ হাসান আসকারী, আমিনুল ইসলাম, মোঃ আশিয়াকুল্লাহ, মোঃ মাহফুজুর রহমান, জাহিদুল ইসলাম, মোঃ মেহেদী হাসান, মোঃ শরিফুল হাসান, মোঃ কাউছার হোসেন, দীপ্ত কুমার দে, মোঃ রাফসান জানি, মোঃ বিল্লাল হোসেন, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান, মোঃ আতিকুল ইসলাম, মেঃ হাবিবুল্লাহ, মোঃ মাসুদ, মোঃ কাউছার, মোঃ বায়োজিদ হোসেন, মোঃ আতিকুর রহমান, মোঃ মুরছালিন হাওলাদার, মোঃ জাহিদুল ইসলাম, মোঃ জহিরুল ইসলাম, এমদাদুল হক (রিসিপশন), মোঃ জান্নাতুল ফেরদৌস (পিসিআর ও মেরামত), মোঃ জহিরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম (গাড়িচালক), মোঃ সৈয়দ মাসুম (কাউপম), মাহফুজুর রহমান (গাড়িচালক), মোঃ মিশারুল ইসলাম (বাগান), মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন (মুয়াজ্জিন), মোঃ শফিকুল ইসলাম (গাড়িচালক), তানজিল আহমেদ (গাড়িচালক), শাকিল আহমেদ (পিএ এডিশনাল-২), সাইদুর রহমান (দেহরক্ষী), মোঃ তৌফিকুর রহমান, মোঃ নাজমুল হাসান (গাড়িচালক), মোঃ আল আমিন (প্রকল্পের কাজে), মোঃ সরোয়ার হোসেন (অস্ত্রাগার), রাকিবুল হাসান (পিসিআর ও মেরামত), কাজী শহিদুল ইসলাম (কাউপম), মোঃ নুর ইসলাম (দেহরক্ষী), মোঃ হাসনাত আলী (পিসিআর ও মেরামত), মোঃ জাকির হোসেন (গাড়িচালক, কামপ), মোঃ আব্দুল হাকিম, মোঃ তরিকুল ইসলাম, মোঃ মাহাফুজ হোসেন, তসরিকুল ইসলাম (গাড়িচালক), মোঃ হোসেন শিকদার, হাফেজ মনির হোসেন (ইমাম), শেখ মোঃ এমরান হোসেন, মোঃ মাসুম চৌধুরী, মোঃ মোক্তার হোসেন, মোঃ ফিরোজ হোসেন ও মোঃ ফিরোজ হাসান।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কারারক্ষী, গাড়িচালক, দেহরক্ষী, ইমাম, রিসেপশন, বাগান, অস্ত্রাগার, প্রকল্প এবং পিসিআর ও মেরামত-সংক্রান্ত দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মী রয়েছেন। তবে তাঁদের সঠিক পদবি, বর্তমান কর্মস্থল, সংযুক্তির অবস্থা ও দায়িত্বের ধরন সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
কারারক্ষীদের দিয়ে ব্যক্তিগত কাজ করানোর অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে কারা হেডকোয়ার্টারে কর্মরত কিছু কারারক্ষীকে নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্বের পরিবর্তে উচ্চমান সহকারী ও প্রধান সহকারীদের ব্যক্তিগত কাজ এবং চা তৈরির মতো কাজে নিয়োজিত করা হয়। এ ছাড়া হেডকোয়ার্টারে বিপুলসংখ্যক কারারক্ষী পদায়নের কারণে বিভিন্ন কারাগারে জনবল সংকট ও ছুটি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তাঁদের ভাষ্য, অতীতে এত বেশি সংখ্যক কারারক্ষী একসঙ্গে হেডকোয়ার্টারে কর্মরত ছিলেন না। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা, অনুমোদিত জনবল কাঠামো এবং বর্তমান পদায়ন আদেশ যাচাই করা প্রয়োজন।
বদলি নীতিমালা সবার জন্য সমান প্রয়োগের দাবি
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি, সংযুক্তি ও প্রেষণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, কারাগারের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং জনবল ব্যবস্থাপনার স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মীদের পদায়ন করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে কারা হেডকোয়ার্টারে দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা, তাঁদের পদায়ন ও সংযুক্তির আদেশ, বদলির ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট কারাগারগুলোর জনবল পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই জরুরি
বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বক্তব্য, কারা হেডকোয়াটারের জনবল কাঠামো, বদলি ও পদায়ন সংক্রান্ত আদেশ এবং আইসিটি শাখার ইন্টারনেট সংযোগের চুক্তি ও বিল পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
একই সঙ্গে কারা হেডকোয়টারের কাছে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি উঠেছে।