জামালপুর প্রতিনিধি: জামালপুর সদর উপজেলার ৩নং লক্ষীরচর ইউনিয়ন’র চরযথার্থপুর উজানপাড়া, ভাটিপাড়াসহ চাঁন্দাপাড়া বাজারজুড়ে ব্যাঙের ছত্রাকের মত ভূয়া-তান্ত্রিক ও কবিরাজ ডিজিটালপ্লাট ফরম টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রতারণার জাল ফেলে পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যাগ্রস্থ ব্যক্তিতের সেবা দেওয়ার কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে ভূয়া-তান্ত্রিক ও কবিরাজগণ তাদের টিকটক আইডিতে নানা চটকদার, ভীতিকর, মানুষকে যাদু, টোনা, মরণব্যাধি বান, মৃত মানুষের মাথা ও হাত-পায়ের হাড়, গরুর হাড় ব্যবহার করে, জ্বীন-ভূতের মাধ্যমে দেশ/বিদেশের বিভিন্ন ছেলে মেয়েকে বাধ্যকরা, বিবাহ বিচ্ছেদ, স্বামী-স্ত্রী অমিল সম্পর্ক মিলিয়ে দেওয়া, সংসারে কলহ বন্ধ, ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ভালোবাসা সম্পর্ক জোরদার করা, ছেলে অথবা মেয়েকে বাধ্য না হলে তাদের অঙ্গহানিসহ বিভিন্ন ক্ষতি করা বা সায়েস্তার করাসহ ভালোবাসার বাঁধনে আবদ্ধ করে দেওয়ার নানা তান্ত্রিক ভিডিও তৈরি করে তাদের নিজ নিজ টিকটক আইডিতে ভাইরাল করে।
পরে বিভিন্ন সমস্যায় পড়া দেশ ও বিদেশে থাকা হাজারো সাধারণ মানুষ এদের ভূয়া ভিডিও দেখে প্রলুব্ধ হয় এবং যার যার প্রয়োজন অনুযায়ি অনলাইন ও টিকটক তান্ত্রিক ও কবিরাজদের আইডিতে মেসেজ দিয়ে প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে। এসময় ভূয়া তান্ত্রিক ও কবিরাজগণ প্রথমে গ্রাহককে সালাম দিয়ে সুন্দর ও ভদ্রভাবে তাদের নাম ঠিকানা ছবিসহ গ্রাহক কি সেবা নিতে আগ্রহ দেখায়, সেই তথ্য গুলো টিকটক মেসেঞ্জার ও ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপ’র মেসেঞ্জারের মাধ্যমে সংগ্রহ করে। পরে জ্বীন-ভূত, জাদু-টোনা, কবিরাজি ও তান্ত্রিকতার মাধ্যমে তাদের সেই কাজ করে দেওয়া হবে বলে প্রলোভন দেখায়। সেবা গ্রহিতা সেই ব্যক্তিগণ বিশ্বাস অর্জন করতে যা যা করার দরকার তারা প্রথমে তাই করে থাকে।
এক পর্যায়ে গ্রাহকের দূর্বল জায়গা ও বিষয় সম্পর্কে সু-কৌশলে সকল তথ্য মেসেঞ্জারে নিয়ে নেয় ও জেনে নেয়। বিষয় ও সমস্যা জানার পর শুরু হয় মূল খেলা। আর এই খেলাই হলো টাকার খেলা। গ্রাহকের কাছে কাজের ধরণ বুঝে তাদেরকে বিভিন্ন উপকরণ কেনার কথা বলে যেমন, আসন খরচ, লাল শালুক, জাফরান কালি, মোনামোনির বীজ, কষ্টি পাথর, জয়তনের তৈল, কবাক চিনি ইত্যাদি।
বিভিন্ন অসুস্থ্যত ব্যক্তিকে সুস্থ করে দেওয়া, অল্প বয়সের ছেলে মেয়েদের প্রেম-ভালোবাসায় আবদ্ধ ও বাধ্যকরা, বিদেশে গমন, সরকারি-বেসরকারি চাকুরি পাইয়ে দেয়া, বিদেশে পাঠানো বা লটারি পাইয়ে দেওয়া, জমির রক্ষা, মামলা থেকে মুক্তি, মামলা জিতিয়ে দেওয়া, স্বামী-স্ত্রী বসকরা, বন্ধ্যা নারীদের গর্ভে সন্তান এনে দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়।
মিথ্যা প্রলোবনের ফাঁদে ফেলে এটা করলে সেটা হবে- সেটা করলে এটা হবে বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রথমে টাকা হাতিয়ে ন্যায় ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। তারপর ৩ দিনের মধ্যে তান্ত্রিক বিদ্যার কাজ বিফলে পরিনত হলে ভোক্তভোগিরা ফের তান্ত্রিক’র সাথে যোগাযোগ করলে তখন তারা বলে তোমাকে যে নিয়ম দিয়েছিলাম সেই নিয়মগুলো মধ্যে ১-২ টি নিয়ম বাধ পড়েছে। সেই জন্য জ্বীনে রাগ করেছে জ্বীনের রাগ না ভাঙ্গালে জ্বীন তোমার বড় ধরনের ক্ষতি করবে এরকম ভয়ভীতি দেখিয়ে হাতিয়ে নেয় গরু-মহিষ, ছাগল, খাসি-পাঠা। আবার পুজাঁ অর্জনা, তাবিজ কবজ বানানোর কথা বলে মোবাইলের বিকাশ একাউন্টের মাধ্যমে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়।
তান্ত্রিক প্রতারকের কথায় বিকাশে টাকা পাঠিয়ে প্রতারিত হয় ভোক্তভোগিরা। শেষে কাজের কাজ কোনটিই যখন না হয় তখন ভিকটিমগণ তান্ত্রিকের বা কবিরাজের আইডিতে মেসেজ দিলে তারা নানা বাহানায় প্রথমে জ্বীনের মাধ্যমে বা আসন বসানোর পর কাজটি আরও ভালোভাবে দেখা হচ্ছে বা চলমান আছে বলে এড়িয়ে যায়। গ্রাহক যখন তার কোন কাজ হচ্ছেনা বলে টিকটকসহ বিভিন্ন মেজেঞ্জারে ভূয়া তান্ত্রিক ও কবিরাজদের জানায় তখন তারা নানা বাহানায় আবারও টাকা দাবি করা করে। গ্রাহক টাকা দিতে অসম্মতি জানালে বা মেসেজে বিষয় সম্পর্কে জবাব চাইলে তান্ত্রিকরা উক্ত গ্রাহকের মেসেঞ্জারটি বøক করে দেয়।
বিভিন্নভাবে ভোক্তভোগিরা আবারও জবাব চাইলে তান্ত্রিকরা তাদের মরণবান বা ক্ষতি করবে বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। একপর্যায়ে নিরাস হয়ে তাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় পরে ভোক্তভোগিরা আরেক তান্ত্রিকের সাথে যোগাযোগ করলে সেখানেও অর্থ খোয়াতে হয় ভোক্তভোগিদের।
এভাবেই প্রতিনিয়ত নতুন নতুন মানুষ সেবা নেয়ার জন্য আসে এবং প্রতারিত হচ্ছে। এক একজন ভূয়া তান্ত্রিক বা কবিরাজ ১ থেকে ১০-১২টি আইডি রয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দক্ষ লোক দিয়ে এই আইডিগুলো তারা পরিচালনা করে। ফলে গড়ে এক একজন তান্ত্রিক বা কবিরাজ মাসে প্রায় কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতারণার মাধ্যমে ফকির থেকে কেউ লাখ পতি আবার কেউ কোটি পতি বনে গেছে। ভূয়া এই তান্ত্রিক ও কবিরাজগণ ডিজিটাল প্লাটফর্মসহ মোবাইলের মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানে নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে দক্ষতা ও সচেতনতার সাথে এই কাজ গুলো করে থাকে। এরা এতোই দক্ষ বা সতর্কভাবে কাজ করে যে নিজেরা ধরাছোয়ার বাইরে থাকে তারা নিজের নামে বা নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্ড ব্যবহার না করে ভিন্ন অসৎ উপায়ে ফোন নাম্বার, বিকাশ নাম্বার, বা টিকটক আইডি তৈরি করে থাকে।
এরা কোন একটি দরিদ্র ও অশিক্ষিত মানুষকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ভোটার আইডি কার্ড ব্যবহার করে প্রথমে কয়েকটি সিমকার্ড তুলে নেয়। এরপর সেই সীমকার্ডে বিকাশ একাউন্ট চালু করে সেই মোবাইল’র মাধ্যমে ডিজিটাল প্লাটফরম টিকটকে ভূয়া নামে বেনামে আইডি খোলে চটকদার ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করে। যা দেখে সাধারণ ও অল্পশিক্ষিত কিংবা বিপদগ্রস্থ শিক্ষিত মানুষও তাদের ফাঁদে পা’ফেলে।
সেই সুযোগে এই প্রতারক ভূয়া তান্ত্রিক বা কবিরাজরা হাতিয়ে নেয় হাজার হাজার, লাখ লাখ টাকা। এভাবেই এই অঞ্চলের অসাধু ভূয়া তান্ত্রিকরা হাজার হাজার টাকা থেকে লাখ ও কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। সরেজমিনে আরো জানা গেছে, এই ভূয়া তান্ত্রিক ও কবিরাজি ব্যবসার মাধ্যমে অনেকেই ইতিমধ্যে লাখ থেকে কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। যাদের কোন ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি বা জমি জমা নেই। নেই কোন আয়ের উৎস।