নিজস্ব প্রতিবেদক:
পঞ্চগড় জেলা কারাগারে বন্দিদের খাবার সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি অর্থ ব্যবহারে বড় ধরনের অনিয়ম ও বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগকে ঘিরে দীর্ঘদিন পরও নানা প্রশ্নের উত্তর মিলছে না। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, কারাগারের তৎকালীন জেলার মো. আব্দুল ফাত্তাহের বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বিভাগীয় তদন্তের পর তাকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়।
অভিযোগের বিবরণে বলা হয়েছে, বন্দিদের খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রে ভুয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিল-ভাউচার দাখিলসহ বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তদন্তের পর জেলারকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার আওতায় আনা হলেও পুরো ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিলেন এবং অর্থ ছাড় ও বিল অনুমোদনের ক্ষেত্রে কার কী ভূমিকা ছিল—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
বিশেষ করে আলোচনায় আসছে তৎকালীন রংপুর বিভাগে কর্মরত ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের তদারকি ও প্রশাসনিক ভূমিকা। একজন জেলা কারাগারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যখন কোটি টাকার সরকারি অর্থ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন সেই সময়কার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিষয়টি তদারকি করেছিল—এ প্রশ্নের উত্তর জনসম্মুখে আসা প্রয়োজন।
কারাগারের আর্থিক কার্যক্রমে বিল-ভাউচার যাচাই, সরকারি অর্থের হিসাব, খাবার সরবরাহের পরিমাণ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বৈধতা এবং অর্থ ছাড়ের বিভিন্ন ধাপ থাকে। ফলে এত বড় অঙ্কের অনিয়মের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুধু মাঠপর্যায়ের একজন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণ করেই তদন্ত শেষ হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এদিকে বিভিন্ন মহলে ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাতের যে দাবি আলোচিত হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকার অঙ্কের পার্থক্যও পরিষ্কার করা দরকার। সরকারি অডিট প্রতিবেদন, তদন্ত প্রতিবেদন, বিভাগীয় মামলার নথি এবং অর্থ উদ্ধারের তথ্য প্রকাশ করা হলে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকবে না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তৎকালীন রংপুর বিভাগে কর্মরত ডিআইজি প্রিজন মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন কি না, নিয়মিত আর্থিক ও প্রশাসনিক তদারকি হয়েছিল কি না এবং অনিয়ম ধরা পড়ার পর তাদের পক্ষ থেকে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?
যদি তদন্তে কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা, তদারকিতে ব্যর্থতা বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
তাই পঞ্চগড় জেলা কারাগারের কথিত কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় শুধু একজন জেলার এবং একজন কারারক্ষীকে বরখাস্ত করেই বিষয়টি শেষ হয়েছে কি না, নাকি তৎকালীন ডিআইজি প্রিজন, কারা সুপার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সচেতন মহলের দাবি, সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় না দিয়ে পুরো ঘটনার উৎস, অর্থের প্রবাহ, বিল অনুমোদন, তদারকি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল ও অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতিও জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।